শুরুর কথা
বিসমিহি তা‘আলা
আলহামদুলিল্লাহ” আল্লাহ পাকের অসংখ্য-অগনিত শুকরিয়া, যিনি আমাদের সৃষ্টিকর্তা ও রিযিকদাতা এবং সঠিক পথের প্রদর্শক। তাঁর অশেষ করুণা ও দয়া ছাড়া কোনো সৎকর্মই আমাদের পক্ষে সম্পাদন করা সম্ভব নয়। সালাত ও সালাম বর্ষিত হউক মহানবী হযরত মুহাম্মাদ সা. এর উপর এবং তাঁর পবিত্র পরিবারবর্গ ও প্রিয় সাহাবীগণের উপর।
পর কথা
আজকাল বাংলাদেশে মাদরাসা শিক্ষার দু’টি ধারা চলছে। ফলে দেশের সমস্ত মাদরাসা দু’টি শ্রেণীতে বিভক্ত।
এক শ্রেণীর মাদরাসা সরকার কর্তৃক পরিচালিত বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড এর তত্ত্বাবধানে চলছে। এ মাদরাসাগুলো সরকারী পাঠ্যসূচী অনুসরণ করে এবং সরকারী অনুমোদন ও সরকারী সাহায্যে পরিচালিত হয়ে থাকে।
অপর দিকে আরেক শ্রেণীর মাদরাসাসমূহ দ্বীনী শিক্ষা অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে নিজস্ব বলিষ্ঠ পাঠ্যসূচী ও কর্মসূচী অনুসরণে কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে চলছে। এ মাদরাসাগুলো আমাদের দেশে “কাওমী মাদরাসা” নামে পরিচিত অর্থাৎ যে সকল মাদরাসা পরিচালনা হয়-ই দেশের সাধারণ মানুষ বা ধর্ম ভীরু বিশেষ ব্যক্তি বর্গের মাধ্যমে।
দ্বীনী শিক্ষাই আলো। ঐশী বা খোদা প্রদত্ত শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষই একমাত্র আলোকিত মানুষ। যে শিক্ষা নূর ছড়ায়, মানুষকে আলোকিত করে এবং মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটায়, তা হলো নববী শিক্ষা। যা মানুষকে মহান আল্লাহর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। স্রষ্টার সঙ্গে সৃষ্টির সম্পর্ক স্থাপন ও বান্দার সঙ্গে স্রষ্টার নিবিড় ও গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলে। সে শিক্ষা নবুওয়তের দ্বিপাদার থেকে বিচ্ছুরিত হয়ে পৃথিবীর দিগদিগন্তে নূরের ঝলকে সৃষ্টি করেছে। পাক-ভারতের মাটিও ধন্য হয়েছে সে নূরের রশ্মিতে। ফলে এক সময়ে মানুষের মুখের প্রবাদ ছিল ‘শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড’। বর্তমানে অনেকেই পরিবর্তন করে বলেন, শুধু শিক্ষা নয়, বরং ‘সুশিক্ষাই হল জাতির মেরুদন্ড’। আমি তাদের সাথে একমত। একথা সুস্পষ্ট যে, সকল শিক্ষার মাঝে একমাত্র কুরআনে কারীমের শিক্ষাই হল আদর্শবান সুশিক্ষা। নবী করীম সা. এরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ঐ ব্যক্তি,যে কুরআন মাজীদ শিক্ষা করে এবং শিক্ষা দেয়। (বুখারি: ২/৭৫২)
কুরআনি শিক্ষার শ্রেষ্ঠত্বের বিষয়টি শুধু বর্ণিত হাদীস শরীফ দ্বারাই নয়, বরং কুরআনে কারীমের বিভিন্ন আয়াত ও অন্যান্য হাদীস শরীফ দ্বারাও প্রমাণিত। এ শিক্ষা (ইলম) অর্জন করাকেই রাসূল সা. ফরজ বলে ঘোষণা করেছেন তাঁর পবিত্র বাণীতে। তিনি সুস্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন ,‘দ্বীনি ইলম অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের উপর ফরজ।
ব্যক্তি, রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার ও আন্তর্জাতিক পর্যায়সহ জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে সফলতা লাভের জন্য দ্বীনি শিক্ষা অর্জনের বিকল্প নেই। তাই এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে আজ থেকে প্রায় দেড়শত বছর পূর্বে ভারতের দেওবন্দ নামক এলাকায় স্বয়ং রাসূল সা. এর ইশায় উক্ত প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠিত হয়। যা আজকে কওমি মাদরাসার প্রাণকেন্দ্র বলে সকলেই জানি যার নাম ‘দারুল উলূম দেওবন্দ’।
ভারতবর্ষকে ইংরেজ-বেনিয়াদের করাল গ্রাস থেকে মুক্ত করার সর্ব প্রয়াসী সংগ্রাম নিয়ে ১৮৫৭ সালে উলামায়ে হিন্দের নেতৃত্বে যে ‘সিপাহি বিপ্লব’ সংঘটিত হয়, তাতে দুঃখজনকভাবে মুসলমানরা পরাজিত হলে মুসলিম সমাজের উপর নেমে আসে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের পৈশাচিক নির্যাতন ও অকল্পনীয় নিপীড়ন। হিংস্র ও জালিম ইংরেজরা শুধু শারীরিক নির্যাতনেই ক্ষ্যান্ত ছিল না, বরং মুসলমানদের শিক্ষা-দীক্ষা,সভ্যতা-সংস্কৃতি নিশ্চিহ্ন করতে আঘাত হানে ইসলামি শিক্ষানীতির উপরও। তারা প্রণয়ন করে এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যা শিখে মুসলিম জাতি রক্তে-মাংসে ভারতীয় হলেও চিন্তা - চেতনায় হয়ে উঠবে নাস্তিকবাদী কালচারের খাঁটি ইউরোপীয়। সময়ের সে ক্রান্তিলগ্নে বৃটিশদের শিক্ষার বিষফল থেকে মুসলিম জাতিকে রক্ষার পাশাপাশি তাদের ঈমান-আক্বীদা ও তাহযীব-তামাদ্দুনের হেফাযত এবং ইসলাম বিদ্বেষী মতাদর্শের মোকাবেলায় মুসলিম জনবলকে সংঘবদ্ধ করার সুমহান লক্ষ্যে ‘দারুল উলূম দেওবন্দ’ মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। যা ‘আযাদি আন্দোলনের’ তৎকালীন সেনাপতি ও ‘সিপাহি বিপ্লবের’ অন্যতম সিপাহসালার হাজী এমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মাক্কী রহ. এর পরামর্শক্রমে, ঐতিহাসিক ‘শামেলি যুদ্ধের’ বীর সেনাপতি হুজ্জাতুল ইসলাম কাসেম নানুতবী রহ. ও সমকালীন উলামায়ে কেরামের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে।
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এ যাবৎ দীর্ঘ দেড়শত বছরে সে সকল আকাবিরে দেওবন্দের চিন্তা-চেতনা ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য দারুল উলূমের কৃতিসন্তানরা যেভাবে অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন, তাতে এশিয়া মহাদেশসহ বিশ্বের আনাচে-কানাচে গড়ে ওঠেছে দারুল উলূমের আদর্শের প্রতীক শত-সহস্র কওমি মাদরাসা। মাদরাসাতুল কুরআন ওয়াসসুন্নাহ ঢাকাও সে দেওবন্দ বৃক্ষেরই একটি ফল এবং তারই ধারাবাহিকতার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। এ প্রতিষ্ঠান নিজস্ব কোনো সিলেবাস বা গবেষণা কৈন্দ্রিক নয়, বরং দারুল উলূম দেওবন্দেরই পদাঙ্ক অনুসারী এবং সে সকল আকাবিরদের তৈরি তা’লীম, তারবিয়াতের নীতিমালার উপরই প্রতিষ্ঠিত। তাই নববি আদর্শে আদর্শবান হতে এবং আকাবিরদের পথে চলতে আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে সাহায্য ও সফলতা দান করবেন বলে আমরা আশাবাদী। আমীন!