মূল কনটেন্টে যান
মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬ ফোন: 01831-513-188
মাদরাসাতুল কুরআন ওয়াসসুন্নাহ ঢাকা

শিক্ষক মণ্ডলীর তথ্যাবলী

শিক্ষকের বিশেষ মর্যাদা 

জ্ঞানীদের মর্যাদা কুরআনে : আল্লাহ তায়ালা বলেন,তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদের জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাদের মর্যাদা বহু স্তরে উন্নীত করবেন। (সূরা আল-মুজাদালাহ : ১১)

এই আয়াত জ্ঞানীদের মর্যাদার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। জ্ঞান মানুষকে আলোকিত করে এবং সমাজকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে সাহায্য করে। ফলে যে শিক্ষক মানুষকে জ্ঞান দেন, নৈতিকতা শেখান এবং কল্যাণের পথে উদ্বুদ্ধ করেন, তাঁর দায়িত্ব নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে শিক্ষকের মর্যাদা শুধু পদবি বা সামাজিক সম্মানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন প্রকৃত শিক্ষক তাঁর আচরণ, সততা, দায়িত্ববোধ ও জ্ঞান চর্চার মাধ্যমে শিক্ষার্থীর সামনে জীবন্ত আদর্শ হয়ে ওঠেন।

কুরআন শিক্ষা ও শিক্ষকের বিশেষ মর্যাদা : রাসুল সা.বলেছেন,তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে, যে কুরআন শিখে এবং শিক্ষা দেয়। (বুখারি)

এই হাদিসে শিক্ষা দেওয়ার মর্যাদা অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে কুরআন শিক্ষা ও প্রচারকে উত্তম কাজ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, উপকারী জ্ঞান অন্যের কাছে পৌঁছে দেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে সম্মানজনক আমল। আজকের শিক্ষকরা ধর্মীয় শিক্ষা ছাড়াও বিজ্ঞান, চিকিৎসা, গণিত, ভাষা, প্রযুক্তি, কৃষি, অর্থনীতি, সাহিত্যসহ নানা বিষয়ে জ্ঞান বিতরণ করছেন। মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত উপকারী জ্ঞান সমাজকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

রাসুল সা. ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক : রাসুল সা. ছিলেন মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক। তিনি শুধু কথা দিয়ে শিক্ষা দেননি, নিজের জীবন, চরিত্র ও আচরণের মাধ্যমে শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর শিক্ষা পদ্ধতিতে ছিল কোমলতা, ধৈর্য, প্রজ্ঞা, প্রশ্নের উত্তর, বাস্তব উদাহরণ এবং মানুষের সামর্থ্য ও পরিস্থিতির প্রতি বিবেচনা। তিনি শিক্ষার্থীর ভুলকে সবসময় অপমানের কারণ বানাতেন না, বরং সংশোধনের সুযোগ দিতেন। এখান থেকে আধুনিক শিক্ষকরাও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিতে পারেন-শিক্ষা শুধু তথ্য মুখস্থ করানোর নাম নয়, শিক্ষার্থীর মধ্যে ভালো মানুষ হওয়ার সক্ষমতা তৈরি করাও শিক্ষার উদ্দেশ্য।

শিক্ষকের দায়িত্ব শুধু পাঠদান নয় : একজন আদর্শ শিক্ষকের দায়িত্ব বহুমাত্রিক। তিনি শিক্ষার্থীর জ্ঞান বাড়াবেন, একই সঙ্গে নৈতিকতা ও মানবিকতার বিকাশে সহায়তা করবেন। সত্যবাদিতা, দায়িত্বশীলতা, শৃঙ্খলা, অন্যের প্রতি সম্মান, দেশ ও সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ - এসব গুণ শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচরণ ও আত্মীয়স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন। (সূরা আন-নাহল : ৯০) শিক্ষা ব্যবস্থায় এই মূল্যবোধগুলো বাস্তবায়িত হলে শিক্ষা শুধু পরীক্ষার ফলাফল কেন্দ্রিক থাকবে না, বরং তা মানুষের চরিত্র গঠনের শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠবে।

শিক্ষকের প্রতি সম্মান: ইসলাম জ্ঞানী ব্যক্তির সম্মানকে গুরুত্ব দিয়েছে। শিক্ষার্থীর উচিত শিক্ষকের প্রতি শিষ্টাচার, ভদ্রতা ও কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন করা। তবে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক সম্মান ও দায়িত্বের ভিত্তিতে। শিক্ষক যেমন শিক্ষার্থীর মর্যাদা রক্ষা করবেন, শিক্ষার্থীকেও শিক্ষকের সম্মান বজায় রাখতে হবে। শিক্ষককে সম্মান করার অর্থ অন্ধ আনুগত্য নয়। বরং জ্ঞান, যুক্তি, সৌজন্য ও নৈতিকতার সঙ্গে মতবিনিময় করাই শিক্ষার সৌন্দর্য।

শিক্ষকতা আমানত : ইসলামের দৃষ্টিতে দায়িত্ব একটি আমানত। আল্লাহ তায়ালা বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন, তোমরা আমানতসমূহ তাদের হকদারদের কাছে পৌঁছে দাও। (সূরা আন-নিসা:৫৮) শিক্ষকতা একটি বড় আমানত। কারণ একজন শিক্ষক প্রতিদিন বহু শিক্ষার্থীর চিন্তা ও ভবিষ্যতের উপর প্রভাব ফেলেন। তাই শিক্ষকের জ্ঞান, সময়, কথা ও আচরণ- সবকিছুর মধ্যে দায়িত্বশীলতা থাকা প্রয়োজন। একজন শিক্ষক যদি সততা, ন্যায় পরায়ণতা ও মানবিকতার উদাহরণ তৈরি করতে পারেন, তাঁর প্রভাব প্রতিষ্ঠানের সীমানা ছাড়িয়ে পরিবার ও সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। এজন্য কেউ কোনো দায়িত্ব অবহেলায় পালন না করা।

কেমন হওয়া উচিত আদর্শ শিক্ষক : আদর্শ শিক্ষক হবেন জ্ঞানী, ন্যায়পরায়ণ, ধৈর্যশীল, দায়িত্বশীল ও মানবিক। তিনি শিক্ষার্থীর ভুলকে সংশোধনের সুযোগ হিসেবে দেখবেন। দুর্বল শিক্ষার্থীকে অবহেলা করবেন না এবং মেধাবী শিক্ষার্থীকে অহংকারে উৎসাহিত করবেন না। তিনি নিজের আচরণের মাধ্যমে শেখাবেন-সততা কেন গুরুত্বপূর্ণ, সময়ের মূল্য কী, অন্যকে সম্মান করা কেন প্রয়োজন এবং জ্ঞান কেন মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা উচিত।

শিক্ষকের  মর্যাদার  ব্যাপারে জ্ঞানীদের কথা

১.হযরত রাসূলে আরাবী সা. বলেছেন "আমি শিক্ষক হিসেবে প্রেরিত হয়েছি"। এছাড়া তিনি আরও বলেছেন, "জ্ঞান অর্জন করো এবং যার কাছ থেকে জ্ঞান অর্জন করো, তাকে সম্মান করো।"

২.হযরত আলী রাযি, বলতেন, আমি তার গোলাম, যিনি আমাকে একটি হরফ শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি চাইলে আমাকে বিক্রি করতে পারেন, অথবা মুক্ত করতে পারেন। আবার চাইলে দাসও বানিয়ে রাখতে পারেন।

৩.নবী করীম সা. বলেছেন, দাঁড়ি-চুল পাকা মুসলমান, কুরআন বহনকারী (শিক্ষক) এবং ন্যায়পরায়ণ বাদশাকে সম্মান করা আল্লাহকে সম্মান করার সমতুল্য।

৪. ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. বেয়াদবী হয়ে যাওয়ার আশংকায় তার উস্তাদের নাম পর্যন্ত মুখে উচ্চারণ করতেন না। প্রয়োজন হলে লকব দ্বারাই যথেষ্ট করতেন। হে ছাত্র! বেশী বেশী উস্তাদের সোহবাত লাভ করো।

৫. ইমাম শাফেয়ী রহ. তিনি তাঁর শিক্ষক ইমাম মালেক রহ. এর সামনে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে কিতাবের পৃষ্ঠা উল্টাতেন, যাতে আওয়াজ না হয়।

৬. আল্লামা শায়েখ ইলিয়াস রহ. ইন্তেকালের পূর্বে ছাত্রদের উপদেশ স্বরুপ বলেছিলেন, “তোমরা শিক্ষকদের সম্মান করবে এবং তাদের সাথে আদব রক্ষা করে চলবে। শিক্ষকই হলেন ইলমে দীন হাসিলের সবচেয়ে বড় অসিলা। যিনি দীন সম্পর্কিত একটি শব্দ বা বাক্য কাউকে শিক্ষা দিবেন, তিনি তার মনিবতুল্য”।

৭. হাকিমুল উম্মত শাহ আশরাফ আলী থানবী রহ. ছাত্রজীবনে প্রতি জুমার দিনকে উস্তাতদের খেদমতের জন্য নির্ধারণ করতেন। জুমার দিন তিনি তার শিক্ষক মাওলানা ইয়াকুব নানুতবী রহ., মাওলানা দেহলবী রহ., মাওলানা মানফায়াত আলী রহ. সহ আরো অন্যান্য শিক্ষকদের এক ঘণ্টা করে খেদমত করতেন।

আল্লাহ পাক আমাদের সকলকে শিক্ষকের মান সম্মান রক্ষা করে চলার দাওফিক দান করুণ।